কিন্তু আমাদের মধ্যে এখনও ভাষাকে বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে আবেগের প্রাধান্য বেশি থাকে।

ভাষার বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে আবেগের প্রভাব বেশি—এই বিষয়টিকে যদি ব্যাখ্যা করতেন?

শিশির ভট্টাচার্য্য : দেখুন, প্রতিবছর যখনই ফেব্রুয়ারি মাস আসে, তখন সারাদেশেই বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে দৃশ্য, পাঠ্য ও শ্রাব্য মিডিয়ায় অনেক কাজ দেখতে পাওয়া যায়। খোদ বইমেলাই এ সময় সবচেয়ে বড় আয়োজন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অনেকেই অভিযোগ করছেন, তারা অতীতের সেই ভাষার ফেস্টিভ আবহের জৌলুসটুকু দেখতে পাচ্ছেন না। এখানে ভাষাকে নিয়ে যুক্তিভিত্তিক বিশ্লেষণের চেয়ে আবেগ বেশি দেখা যায়। যেমন, অনেকেই দাবি করেন বাংলা একটি শুদ্ধ-পবিত্র ও সুন্দর ভাষা। এখন যখনই কেউ এমন দাবি করেন, তখন ধরেই নিতে হয় এমন কিছু ভাষাও আছে, যেগুলো ‘অশুদ্ধ-অপবিত্র-অসুন্দর’। অথচ ভাষাবিজ্ঞান তো এই বিভাজন স্বীকার করে না। সব ভাষাই আসলে শুদ্ধ-পবিত্র-সুন্দর হবার কথা। প্রশ্ন হচ্ছে, কোনো ভাষা শুদ্ধ-পবিত্র-অসুন্দর—এমন ধারণার ক্ষেত্রে মানদণ্ড আসলে কী? মনে রাখতে হবে, প্রতিটি ভাষাই কারও না কারও মাতৃভাষা। ‘মাতৃভাষা’ বাংলা যদি সুন্দরী হয়ে থাকে, তবে ‘ধাত্রীভাষা’ ইংরেজি বা ফরাসিও কুরূপা-কুৎসিত হবার কোনো কারণ নেই। তবে যেহেতু বাংলা আমাদের মাতৃভাষা, তাই আমাদের বাংলাকে কেন্দ্র করেই অন্য ভাষার তুলনামূলক আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে।

এ ক্ষেত্রে আলোচনাটুকু কেমন হওয়া উচিত? ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আসলে অনেকে আবেগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বলেন, ভাষার দূষণ ঘটছে। বাস্তবে, ভাষাদূষণ বলে কিছু ঘটে না। কারণ, ভাষা পুরোপুরি জীবন্ত। এজন্য ভাষাকে শুধু আবেগ দিয়ে বিচার করলে চলবে না। ভাষাকে তার নিজের মতো চলতে দিতে হবে। এ বিষয়ে আমি বহু প্রবন্ধে লিখেছি, ভাষা শুধু আবেগেরই নয়, এটি রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিকও বটে। আর এই বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়, ভাষাকে তার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ থেকেও বিচার করতে হবে। আমরা প্রায়ই বলি, বাংলা ভাষা বা অন্য যেকোনো ভাষার প্রভাব সংস্কৃতিতেও পড়ে। এজন্য টিভি, সিরিয়াল ও সংবাদপত্রের ভাষাকে নিয়ে কিছু সমালোচনা থাকে। বলা হয়, ভাষাদূষণের জন্য এফএম রেডিও বা টেলিভিশনের নাটক-সিরিয়াল দায়ী। রেডিও শুনে বা টেলিভিশন দেখে কেউ ভাষা শেখে না। রেডিও বা টেলিভিশন সেই ভাষাই ব্যবহার করে, যে ভাষায় শ্রোতা বা দর্শক কথা বলে। এফএম রেডিওর পক্ষে বাংলা ভাষা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। এখানে যা হচ্ছে তা ভাষাদূষণ নয়, ভাষামিশ্রণ। আবার সাহিত্যে যেভাবে ভাষার ব্যবহার হয় সেটি সর্বোপরি পাঠকের, বুদ্ধিজীবীর ও চিন্তকদের ক্ষেত্রেই বেশি কার্যকর বলে মনে হয়। এখানেও মিশ্রণ ঘটে। আমার এই বক্তব্যের ক্ষেত্রে ভিন্নমত অবশ্যই রয়েছে। তবে আমি এভাবেই দেখি।

এ প্রসঙ্গে আরেকটি প্রশ্ন চলে আসে। ভাষার বিকাশে অন্য ভাষার শব্দের প্রভাব রয়েছে। এর নিরিখে বাংলা ভাষার বর্তমান অবস্থাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

শিশির ভট্টাচার্য্য : দেখুন, যেকোনো ভাষাকে নতুন শব্দ সৃষ্টি করতে হয়। নতুন অর্থে পুরোনো শব্দ ব্যবহার করতে হয় এবং অন্য ভাষা থেকে ঋণ নিতে হয়। বাংলা এককালে সংস্কৃত, ফারসি, আরবি থেকে ঋণ নিয়েছে, এখন নিচ্ছে ইংরেজি থেকে। এ ক্ষেত্রে কোনো নিষ্ঠাবান পণ্ডিত ভাবতে পারেন, ‘হাওয়া’, ‘খুন’, ‘সিন্দুক’-এর মতো শত শত আরবি-ফারসি শব্দ ঢুকে বাংলা ভাষাকে ‘অপবিত্র’ করেছে। আবার কোনো বুজুর্গ বিশ্বাস করতে পারেন, ‘বেদি’, ‘স্নাতক’, ‘লক্ষ্মী’র মতো হাজার হাজার সংস্কৃত শব্দ ঢুকে বাংলা ভাষাকে ‘নাপাক’ করে দিয়েছে। এসব ধারণা ভাষাবিজ্ঞানী হিসেবে নিছক কুসংস্কার বলে মনে করি। অন্য ভাষা থেকে শব্দ নিলে যদি ভাষা কলুষিত হয়, তাহলে ধরে নিতে হবে আরবি, সংস্কৃতসহ সব ভাষাই কমবেশি কলুষিত। রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জীবনানন্দ-শামসুর রাহমান-জগদীশ চন্দ্র-রোকেয়া যে ভাষায় লিখেছেন তাতেও প্রচুর বিদেশি শব্দ ছিল। কিন্তু এসব বিদেশি শব্দের উপস্থিতি তাঁদের সাহিত্যসৃষ্টিতে কোনো ব্যাঘাত ঘটিয়েছে—এমন অভিযোগ কেউ করেননি।

আমি মনে করি, ভাষাকে দুই একজন নগর পরিকল্পনাকারীর সচেতন নির্মাণ হিসেবে ভাবা সম্ভব নয়। বরং বলা যায়, ভাষা গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠোপথের মতো বহু মানুষের অসচেতন নির্মাণ। কোনো একক মানুষ বা মানবগোষ্ঠীর পক্ষে সচেতনভাবে তার ভাষাকে বদলানো সম্ভব নয়। ভাষা এমন একটি সিস্টেম বা সংশয়, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বদলায়। বিভিন্ন কারণে একটি ভাষার মধ্যে বহু লক্ষ ‘বিদেশি’ শব্দ এসে ভাষাটিকে প্রবহমান, জীবিত রাখে। এতে ভয়ের কিছু নেই। স্বাগতিক ভাষার ধ্বনিতত্ত্ব ‘উড়ে এসে জুড়ে বসা’ শব্দগুলোর উচ্চারণ এমনভাবে বদলে নেয় যে শব্দগুলো আর বিদেশি থাকে না। আমরা দেখছি, আজ বাংলা ভাষায় বন্যার জলের মতো ইংরেজি শব্দ ঢুকছে। এমনটি ইতিবাচক বলেই দেখি। বাংলা ভাষায় এখন অনুবাদের জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করেছে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নতুন ভাষা শেখার আগ্রহও প্রবল হতে শুরু করেছে। বাংলা ধ্বনিতত্ত্বের নিয়মেই সেগুলো বাংলা ভাষার নিজস্ব শব্দসম্পদ হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে আমাদের একটি নিজস্ব বাংলা ভাষারীতি প্রয়োজন। এই ভাষারীতির নিরিখে সরকারিভাবে বাংলা ভাষার প্রচার-প্রসারে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি। এই কাজটি শুধু বইমেলা বা ফেব্রুয়ারি মাস এলেই করলে হবে না। ভাষার বিকাশে সংবাদমাধ্যম, প্রকাশনা এবং সাহিত্য অঙ্গনের আলাদা আলাদা ভূমিকা রয়েছে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও অধ্যাপনা ও গবেষণার আলাদা ভূমিকা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে আন্তঃসমন্বয় এবং তুলনামূলক আলোচনার পরিসর বছরব্যাপী করতে হবে।

অর্থাৎ বাংলা ভাষার প্রচার-প্রসারের ক্ষেত্রে আপনি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাকে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা বলে দেখেন?

শিশির ভট্টাচার্য্য : কিছুটা অবশ্যই।

এ বিষয়টিকে সরলভাবে ব্যাখ্যা করা

কঠিন। সাংবিধানিকভাবে বাংলা আমাদের রাষ্ট্রভাষা। সমস্যা হলো, এটা আইনগত হলেও কার্যত নয়।