-লুভা নাহিদ চৌধুরী
লুভা নাহিদ চৌধুরী। বেঙ্গল পাবলিকেশন্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এটি বেঙ্গল ফাউন্ডেশন পরিচালিত একটি প্রকাশনা কেন্দ্র। দেশের শিল্পসংস্কৃতির বিকাশে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। লুভা নাহিদ চৌধুরী প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি সাহিত্য শিল্প সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা ‘কালি ও কলম’ এর সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য। এই সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে বেঙ্গল পাবলিকেশন্সের বই-ভাবনার কথা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুজাহিদ বিল্লাহ
……………………………………………………………………………………………………………….
বেঙ্গল পাবলিকেশন্সের যাত্রা শুরুর গল্পটা জানতে চাই।
লুভা নাহিদ চৌধুরী : বেঙ্গল গ্যালারি প্রতিষ্ঠার পর, ২০০০ সাল থেকেই প্রকাশনার কাজ শুরু হয়। তখন প্রচুর আর্ট ক্যাটালগ ছাপা হতো। এ ছাড়া ২০০৩ সালে শিল্পবিষয়ক ইংরেজি পত্রিকা ‘যামিনী’ এবং পরের বছর সাহিত্য পত্রিকা ‘কালি ও কলম’ এর যাত্রা শুরু হয়। ২০১২ সালে প্রায় আটটি পত্রিকা বের হতো। তখন মনে হলো, শিল্পসাহিত্য বিষয়ক পত্রপত্রিকা ও বই প্রকাশনার জন্য একটা আলাদা প্রকাশনা সংস্থা থাকা উচিত। তখন থেকেই বেঙ্গল পাবলিকেশন্সের ব্যানারে নিয়মিত বই ও পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। আমরা খুব বেশি বই করিনি। তবে চেষ্টা করেছি বিষয়, অঙ্গসৌষ্ঠব ও প্রকাশনাগুণে বইগুলো যেন ভালো মানের হয়। প্রকাশনার বিষয়টা শুরু থেকেই হাসনাত ভাই (আবুল হাসনাত, ‘কালি ও কলম’ এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক) দেখতেন। উনার যতেœর কারণেই হয়তো আমরা প্রতিবছর একুশে বইমেলায় কোনো না কোনো পুরস্কার পেয়ে এসেছি।
আপনারা যাত্রার শুরু থেকেই বই প্রকাশের ব্যাপারে ধীর-স্থিরভাবে এগিয়েছেন। নিশ্চয়ই এর বিশেষ কোনো কারণ রয়েছে?
লুভা নাহিদ চৌধুরী : শিল্প-সংস্কৃতি পরিচর্যাকারী প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের সহযোগী সংগঠন হিসেবে বেঙ্গল পাবলিকেশন্সের পক্ষে শুধু ব্যবসাসফল বইয়ের দিকে তাকালে চলবে না। কোন ধরনের বই বাজারে কম, অথচ থাকা উচিত আমরা সেদিকে নজর দিয়েছি। এ কারণে আর্টের বইয়ের প্রতি আমরা বরাবরই আগ্রহী। ২০১৭ সালে যখন আমরা ‘বেঙ্গল বই’ প্রতিষ্ঠা করি, তখন পাঠাভ্যাস তৈরির দিকেই আমাদের ঝোঁক ছিল। আমরা মনে করি, যা করতে চেয়েছিলাম তার অনেকটাই সম্ভব হয়েছে। বেঙ্গল বইয়ে নতুন বইয়ের সঙ্গে পুরনো বই রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন ফাউন্ডেশনের সভাপতি আবুল খায়ের। তখন বিষয়টা অদ্ভুত মনে হলেও পরে বুঝেছি যে, পাঠাভ্যাস গড়তে হলে বইয়ের সঙ্গে সংশ্রব তৈরি করতে হবে। বইয়ের সঙ্গে বেড়ে ওঠার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এ কারণেই হয়তো বেঙ্গল বই তরুণদের কাছে খুবই জনপ্রিয়।
বইমেলায় আমরা লক্ষ করি, প্রকাশক প্রতিবছরই বাড়ছে। কিন্তু সে তুলনায় প্রকাশনা মানসম্মত হচ্ছে না কেন?
লুভা নাহিদ চৌধুরী : মান নানাভাবে বিচার করা যায়। সাহিত্যগুণের কথা যদি না বলি, যদি শুধু অঙ্গসৌষ্ঠবের কথাই ধরি, তাহলে বইয়ের দাম একটা বিষয়। আমরা বহু চেষ্টা করেছি বিদেশে (ভারত ও ইতালি) ও দেশে উন্নত ছাপা প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশ্বমানের আর্টের বই বাজারে ছাড়তে। কিন্তু সত্যি কথা বলতে এগুলো পাঠকপ্রিয় হলেও বাজারে চলে না। আমাদের এখানে ভালো কাগজের ঘাটতি আছে। আমদানি করা উচ্চমানের কাগজে উন্নত ছাপাই প্রযুক্তিতে বই ছাপালে তার দাম যা দাঁড়ায়, তা পাঠকের নাগালের বাইরে চলে যায়। আমাদের বাজারে পাঠক যে দামে বই কিনতে পারবেন, প্রকাশককে সেটা বিবেচনা করেই বইয়ের দাম নির্ধারণ করতে হয়। ফলে বই করার আগে অনেক চিন্তা করতে হয়, কীভাবে করলে পাঠকের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকবে।
আমাদের সাহিত্য সমৃদ্ধ। কিন্তু বিদেশি ভাষায় অনূদিত না-হওয়ায় অন্য ভাষাভাষির পাঠকের কাছে বাংলাসাহিত্য পৌঁছাচ্ছে না। কী করা যেতে পারে বলে মনে করেন?
লুভা নাহিদ চৌধুরী : এই কাজটা কম হচ্ছে। তবে ঠিক কেন, তার ভালো উত্তর আমার কাছে নেই। বেঙ্গল পাবলিকেশন্সের নজর স্থানীয় পাঠক ও চাহিদার ওপর। আমরা যদি দেশে পাঠক তৈরি করতে পারি, দেশে কাগজের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, নানারকম কাগজ দেশে বসেই পেতে পারি, বাইরে বই রপ্তানি করতে পারি—তাহলে সেটাই হবে সবচেয়ে উত্তম।
বিদেশে যদি বাংলা সাহিত্যের পাঠক থেকে থাকেন, সেটা খুব ভালো কথা। তবে আমার দেশের মানুষই যদি বই পড়ত তাহলে তো আমরা জোগান দিয়ে শেষ করতে পারতাম না। আমাদের হীনমন্যতা থাকা উচিত নয়। কারণ বাংলাদেশে প্রচুর ভালো লেখক আছেন। অনেক লেখালেখি হচ্ছে। কিন্তু অন্য কিছুর জন্য অনায়াসে টাকা খরচ করলেও উচ্চমূল্যে বই কিনতে অনেকেই নারাজ। হয়তো এই অভ্যাসগুলো তৈরি হতে আরও সময় লাগবে। আমার দেশের লোকই যদি বই পড়ে—প্রকাশক হিসেবে আমার এর চেয়ে বেশি কিছু চাওয়ার নেই।
আবার এ কথাও তো ঠিক, প্রতিবছর বইমেলায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার বই প্রকাশিত হয়। কিন্তু মানসম্পন্ন বই কড়ে গুনে বলা যায়।
লুভা নাহিদ চৌধুরী : এখন বই ছাপানো অনেক সহজ। বহু লেখক নিজ উদ্যোগে বই ছাপছেন। তাতে তেমন কোনো অসুবিধা নেই, তবে মান বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। বাছাই বা সম্পাদনার অবকাশ থাকে না বলে সাহিত্য গুণমান বিচারে বই দুর্বল হতে পারে। বই জনপ্রিয় করারও এখন নানা কৌশল আছে। যেটি বেশি দৃশ্যমান পাঠক বা ক্রেতা তার পেছনেই ছুটতে থাকেন। তাতে বই বিক্রি বাড়ে কিন্তু সাহিত্যের তেমন কোনো উপকার হয় না।
অনেককেই বলতে শুনি, গত পাঁচ বছরে আমার পঁচিশখানা বই বেরিয়েছে। তখন ভাবি যে, পঁচিশটা বই কীভাবে লেখা সম্ভব! সে তো এক জীবনের কাজ! দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সংখ্যাগত বিচারকে আমরা বেশি গুরুত্ব দিই। আমার মনে হয়, এসব মূলত সামাজিক সমস্যার ইঙ্গিত। এই যে সংখ্যার দিকে ঝুঁকে পড়া, বড় বা বেশির প্রতি আকৃষ্ট হওয়া—এগুলোর গোড়ায় রয়েছে অসমতা ও সুনীতির অভাব।
পাঠককে বইয়ের প্রতি আগ্রহী করতে প্রকাশকদের কী ভ‚মিকা থাকতে পারে?
লুভা নাহিদ চৌধুরী : আমাদের খুঁজে বের করতে হবে কীভাবে আমাদের বাজার, দেশের অর্থনীতি এবং মানুষের ক্রয় ক্ষমতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে সহজ ও সুলভে বই বাজারে ছাড়া যায়। বাজে ছাপা বা দুর্বল লেখালেখির বই বাজারে আসুক, তা নিশ্চয়ই কোনো প্রকাশক চান না। এখানে হয়তো কিছু বিষয়ে সরকারের ছাড় দেওয়ার অবকাশ আছে। সেটা সরকারপক্ষ ও প্রকাশক সমিতি আলাপ করে সমাধান করার চেষ্টা করতে পারেন।
আপনাদের প্রতিষ্ঠান থেকে বই প্রকাশ করা তুলনামূলক কঠিন—অনেকেই এমন মনে করেন।
লুভা নাহিদ চৌধুরী : নীতি নির্ধারণ, পাÐুলিপি যাচাই ও সম্পাদনার জন্য সব প্রকাশকের নিজস্ব পরামর্শদাতা থাকেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশকের একটা চরিত্র গড়ে ওঠে, তার প্রকাশনার মধ্য দিয়ে। কিছু কিছু বিষয়ের প্রতি তাদের আগ্রহ থাকে, আবার অন্য বিষয়ের প্রতি ততটা নয়। নতুন লেখকরা যখন আমাদের কাছে আসেন, আমার মনে হয় না সাহিত্য গুণমানসম্পন্ন লেখা আমরা ফিরিয়ে দিই। তবে হ্যাঁ, অনেক সময় নানা কারণে বইয়ের সংখ্যা সীমিত রাখতে হয়।
আমাদের শিশুদের বই প্রকাশনা নিয়ে কী বলবেন?
লুভা নাহিদ চৌধুরী : শিশুসাহিত্যের অবস্থা শোচনীয়। আমরা ‘কালি ও কলম’ থেকে প্রতিবছর তরুণ কবি ও লেখকদের পুরস্কার প্রদান করি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, পরপর দুই বছর শিশুসাহিত্যে (এমনকি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণার ক্ষেত্রেও) কোনো পুরস্কার দেওয়া সম্ভব হয়নি। এখানেও দেখা যাচ্ছে, ভালো মানের লেখা ও ছাপা—দুটোতেই সমস্যা আছে।
একুশে বইমেলার যাত্রাটা কীভাবে দেখছেন? অনেকে চান বইমেলা প্রকাশকদের নিয়ন্ত্রণে থাকুক। এ বিষয়ে আপনার ভাবনা জানতে চাই।
লুভা নাহিদ চৌধুরী : কোনো সন্দেহ নেই যে বইমেলার পরিধি বড় হয়েছে এবং অনেক গোছানো হয়েছে। তবে মানুষের ঝোঁক বড় চকচকে প্যাভেলিয়নের দিকে। ছোট স্টল যাদের তাদের অনেক সময় বসে বসেই দিন কাটাতে হয়। মেলার বিন্যাসের সময় এসব বিবেচনায় রাখলে ভালো হয়।
বাংলা একাডেমির যেসব নির্ধারিত কাজ আছে, তার মধ্যে বইমেলা আয়োজন কতটুকু গুরুত্ব পায়, সেটা নিয়েই প্রশ্ন। এ কারণে কিছু সীমাবদ্ধতাও তৈরি হচ্ছে। তাই প্রকাশক মহল বইমেলাকে এই নির্ভরতা থেকে মুক্ত করতে আগ্রহী। এও মনে রাখা দরকার যে, বাংলা একাডেমি ঘিরেই একুশে বইমেলা গড়ে উঠেছে। সুতরাং এর একটা সুনির্দিষ্ট ঐতিহ্য আছে। এমন তো হতেই পারে, একুশে বইমেলার পাশাপাশি বছরের অন্য কোনো সময়ে প্রকাশকরা সবাই মিলে একটা বড় পরিসরের, বিশ্বমানের আন্তর্জাতিক বইমেলা বা বই-উৎসব আয়োজন করতে পারেন। এতে আমাদের বিশ্বের সঙ্গে নতুন যোগাযোগের পথ তৈরি হবে।
আপনারা তরুণ লেখকদের পুরস্কৃত করছেন। তরুণদের সাহিত্যে আরও ভালো করার জন্য কী পরামর্শ দেবেন?
লুভা নাহিদ চৌধুরী : ‘কালি ও কলম’ পত্রিকায় নতুন লেখকদের জায়গা করে দেওয়ার চেষ্টা আমরা সব সময়ই করেছি। নতুনদের লেখার বিষয়বস্তু আকর্ষণীয় হলেও অনেক সময় ভাষাগত দিকে শক্তিমত্তার কিছু অভাব থেকে যায়। এর প্রধান কারণ হয়তো আমাদের মনোযোগ দিয়ে পড়ার অভ্যাস কমে গেছে। না পড়লে তো ভাষা প্রয়োগ, শব্দভান্ডার, শ্রæতি, ছন্দ—এসব বিষয়ে উন্নত ধারণা তৈরি হয় না। লেখকরা লিখতেই বেশি পছন্দ করবেন সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নিজের একটা শৈলী গড়ে তুলতে হবে, যা একদিনে তৈরি হওয়ার নয়। বেশি বেশি পড়া, নানা স্বাদের সাহিত্য নিয়ে নাড়াচাড়া করার কোনো বিকল্প আছে বলে মনে করি না।


