সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন বলে একটা কথা চালু আছে। কথাটা আমাদের দেশে প্রায় প্রবাদের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। সব প্রবাদের মধ্যে একটা সমাজের দীর্ঘদিনের ভালো-মন্দের অভিজ্ঞতা জমাট বেঁধে থাকে। প্রবাদপ্রতিম এই বাক্যের মধ্যেও আছে। কী সেই অভিজ্ঞতা? অভিজ্ঞতাটা হচ্ছে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের যত স্তর আছে, সব স্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন থাকাটা জরুরি। এর মধ্যে দেশ ও জাতির মঙ্গল নিহিত আছে। রাষ্ট্রের স্তর বলতে আপাতত নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ ও শাসন বিভাগ বুঝলেই চলবে। এই তিন বিভাগের আওতায় রাষ্ট্রের যাবতীয় কাজকর্ম চলে। তার মানে সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন বলতে আমরা বুঝব রাষ্ট্রপতির দপ্তর থেকে শুরু করে মুদি দোকান—সবখানে বাংলা ভাষার নির্বিকল্প ব্যবহার হওয়াকে।

মাতৃভাষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে রাষ্ট্রের সকল স্তরে ব্যবহার না করলে অনেক সমস্যা হয়। ব্যবহার করলে অনেক সুবিধা। সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন ঘটালে কী সুবিধা সে কথা বিশদ করা যাক।

ভাষাকে যত বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলার ভেতর দিয়ে যেতে দেয়া হবে বা নিয়ে যাওয়া হবে, ভাষা তত শক্তিশালী হবে। ভাষা বিচিত্র পরিস্থিতি প্রকাশের সক্ষমতা অর্জন করবে। বহুবিচিত্র কাজের ভেতর দিয়ে ভাষাকে যেতে না দিয়ে নন্দগোপালটির মতো শুধু কাগুজে মর্যাদার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে, শুদ্ধতা শুদ্ধতা বলে চিৎকার করে ‘সম্মানের চিরনির্বাসনে’ কোলে কোলে তুলে রেখে সবকিছু থেকে সরিয়ে রাখলে এই ভাষা কোনোদিন সর্বপরিস্থিতি ব্যাখ্যাক্ষম হয়ে উঠবে না।

উদাহরণ হিসেবে আদালতে বাংলা ভাষা ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা যায়। আদালত-সংশ্লিষ্ট প্রায় সবাই একবাক্যে হুক্কাহুয়া করে ওঠেন যে, বাংলায় আদালত চালানো সম্ভব নয়। রায় লেখা আরো অসম্ভব। তার মানে বাংলা ভাষাটিকে আদালত মোকাবিলা করতে দেয়া হচ্ছে না। নন্দগোপালটির মতো এই পরিস্থিতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হচ্ছে। ফলে বাংলা ভাষা আদালতে ব্যবহৃত হয়ে যে সমৃদ্ধি ও প্রকাশক্ষমতা অর্জন করতে পারত তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই ঘটনাটা ঘটতে দেয়া হয়েছে ও হচ্ছে রাষ্ট্রের চোখের সামনে এবং এক প্রকার রাষ্ট্রের প্রযোজনায়। এ গেল একদিক।

অন্যদিকটি আরো ভয়াবহ এবং ওই সর্বস্তরে রাষ্ট্রভাষা প্রচলনের সাথেই যুক্ত। আদালতে বাংলা ভাষা ব্যবহার হয় না। কারণ, আদালতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউই আদালত-বিদ্যাটা বাংলায় পড়েন না। যে দেশে শিক্ষায় বাংলা ভাষার ব্যবহার নেই, সে দেশে শিক্ষার প্রয়োগক্ষেত্রে বাংলা চালু থাকবে তা কী করে হতে পারে! ফলে রক্তের দামে কেনা আপামর বাঙালির প্রিয় বাংলা ভাষাটি একটি দুষ্টচক্রের আবর্তে আবর্তিত হতে হতে শুধু হীনবলই হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে এক সময় শিক্ষিত শ্রেণির সবাই মিলে ঘোষণা করবে যে, বাংলা ভাষা ঠিক সব জায়গার জন্য ফিট না। এখনই অবশ্য ওই শ্রেণির অনেকে কথাটা বলে থাকেন।

পৃথিবীর একেক ভাষা একেক ধরনের জীবনাভিজ্ঞতা ও বাস্তবতার ভেতর দিয়ে যায়। এই অর্থে ভাষা মানেই অভিজ্ঞতার আকর। যে-ভাষা যত রকম অভিজ্ঞতা-বাস্তবতাকে ধারণ করে সে-ভাষা তত শক্তিশালী। অনুবাদের মাধ্যমে এক ভাষা আরেক ভাষার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়। এতে করে অনূদিত ভাষার শক্তি অর্জনের দ্বার উন্মুক্ত হয়। দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় অনুবাদ হয় অত্যন্ত কম। আবার এখানে অনুবাদ সম্পর্কে যে ধারণাটা চালু আছে তা সংকীর্ণ ও গোলমেলে। অনুবাদ বলতে এখানে শুধু সাহিত্যের অনুবাদকেই বোঝায়। কিন্তু পৃথিবীর বিচিত্র ভাষায় ওইসব জনগোষ্ঠীর কত নতুন কাজ, ভাবনা, চিন্তা, দর্শন, তত্ত্ব, কর্মপরিসর জমা হচ্ছে! বাংলা ভাষা যত ওইসবের মুখোমুখি হতে পারবে ততই শক্তিশালী ও প্রকাশক্ষম হয়ে উঠবে। কিন্তু বাংলায় একে তো অনুবাদ কম হয়, আবার যা হয় তার অধিকাংশই অপাঠ্য। অধিকাংশ অনুবাদের বাক্য ইংরেজি বাক্যের মতো। কৃত্রিমতা এইসব অনুবাদের প্রধান অলংকার। হবে না কেন! বাংলা তো একটা আলাদা ভাষা। এই ভাষা কেন অন্য ভাষার বাক্যগঠনরীতির মধ্যে সঠিক, সজীব, জিয়ল অর্থ উৎপাদন করবে! ইংরেজি বাক্যের গঠনের মধ্যে বাঙালি পাঠক বাংলা পড়ার আনন্দ পাবে কী করে! বাংলার তো একটা নিজস্ব চলনভঙ্গি, ঠাটবাট আছে, নাকি!

পৃথিবীর দেশে দেশে কেন মাতৃভাষাকে শিক্ষার এবং সকল কাজের বাহন হিসেবে চালু রাখা হয়? এদিক থেকে দেখলে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলনের অর্থ অত্যন্ত গভীর ও ব্যাপক। মাতৃভাষাতেই মানুষ চিন্তায় ও সৃজনে সবচেয়ে বেশি লীলাময় থাকে। মাতৃভাষাতেই ভাবনারাশিকে সহজেই শক্ত ভিত্তি ও গাঁথুনির ওপর দাঁড় করানো যায়। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পরিসরে মাতৃভাষার ভিত্তি শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ না হলে কোনো সমাজে-রাষ্ট্রে মৌলিক চিন্তার মানুষ দেখা দেয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। বাংলাদেশে যে নতুন নতুন মৌলিক চিন্তার জগতে শূন্যতা বিরাজ করে, এর অন্যতম কারণ মাতৃভাষার মাধ্যমে চিন্তার চর্চা না থাকা। কোনো প্রকার জরিপ ছাড়াই বলা যায়, বাংলাদেশে বাংলা ভাষার চর্চা এখানে বিদেশি ভাষাচর্চার চেয়েও নিম্নমানের। বাংলা চর্চার পরিসর এখানে এতই সংকুচিত যে, মাতৃভাষা চর্চার মাধ্যমে উন্নতি করেছে এমন সব দেশে বিদেশি ভাষা চর্চার মাত্রা ও সুযোগের সাথেও তুলনীয় হবার নয়। বাংলাদেশে বাংলা চর্চার মান এখানকার বাংলা ভাষায় লেখা যেকোনো সরকারি ডকুমেন্ট বা বাংলা ভাষায় লেখা গবেষণাপত্রগুলোর দিকে চোখ রাখলেই বোঝা যায়। বাংলা ভাষাটা যে এ দেশে এখনো সজীব ও সচল আছে তা শুধু সাধারণ-গরিব মানুষদের মুখে মুখে হাটে মাঠে ঘাটে ব্যবহারের কারণেই। টাকাওয়ালা কেউ এখানে আর বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করে না। ১৯৪৮ সালে যে-কারণে বাংলা ভাষাকে আইন পরিষদে ব্যবহারের অনুপযুক্ত মনে করা হয়েছিল সেই একই কারণে এখনো বাংলাকে কোণঠাসা করে ফেলা হয়েছে। তখনও বাংলাকে মনে করা হতো সাধারণ-গরিব পূর্ব বাংলার মানুষদের ব্রাত্যভাষা, এখনো তাই-ই মনে করা হয়। উর্দুর জায়গায় কেবল ইংরেজি প্রতিস্থাপিত হয়েছে। বাংলার সাথে এখানে ইংরেজি বা উর্দুর আভিজাত্য এখনো যুক্ত হয়নি। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বাংলা একটা কাগুজে বাঘ; শোলার বাঘ; থাবাক্ষমতারহিত। রাষ্ট্র পরিকল্পিতভাবে একে এই অবস্থা করে রেখেছে। অমর্যাদাকর পরিস্থিতির মধ্যে রেখে দিয়েছে।

এই উত্থানরহিত, থাবারহিত অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সর্বস্তরে এর বহুবিচিত্র প্রয়োগ দরকার। সর্বস্তরে মানে সর্বক্ষেত্রে। ব্যবসা-বাণিজ্য, আইন-আদালত, শাসনকার্য, রাজনীতি, চিকিৎসা, বিজ্ঞান, ধর্ম, শিক্ষার সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন দরকার। এটা ব্যক্তি উদ্যোগের ব্যাপার না। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ও তৎপরতার ব্যাপার।

স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত আমরা শুধু জাতীয়তাবাদী আবেগের ফেনা তুলতে পেরেছি। বাংলা ভাষার প্রশ্নে আমরা একটা শবভুক জাতিতে পরিণত হয়েছি। অতীতের গৌরবের গীত গাওয়া ও আত্মশ্লাঘা বোধ করাই আমাদের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অবস্থা থেকে যত দ্রুত বের হওয়া যায় ততই মঙ্গল। রাষ্ট্রের সর্বস্তরে মর্যাদার সাথে বাংলা চর্চা না হওয়ার কারণে ভাষাটি দিনদিন হীনবল হয়ে পড়ছে। শুধু সাহিত্যচর্চা করে এই ভাষার শক্তি ও শ্রী পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। মনে রাখতে হবে আজকাল ভাষা বিষয়ে এই থিসিসও বের হয়েছে যে, সর্বস্তরে মাতৃভাষার ব্যবহার যথাযথভাবে চালু থাকলে জিডিপির হার বেড়ে যায়। কেন ও কীভাবে সেটা রাষ্ট্রকেই উপলব্ধি করতে হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক